হাওরের বুক চিরে অবৈধ বিট বালু উত্তোলন: দিরাইয়ে ফসলি জমি ধসের শঙ্কা, প্রশাসনের নীরবতায় তীব্র ক্ষোভ
- আপডেট সময় : ০৮:৩২:৪৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ নভেম্বর ২০২৫
- / ৪২ বার পড়া হয়েছে
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার তাড়ল ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রাম সংলগ্ন জুরি-পানজুরি বিলের বুক চিরে গভীর সাকশন ড্রেজারের মাধ্যমে চলছে অবৈধ বিট বালু উত্তোলনের মহোৎসব। দিরাই-শাল্লা সড়ক ধরে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে পাইপ টেনে হাওরের একেবারে গভীর থেকে বালু তোলা হচ্ছে, যা স্থানীয়দের মতে শুধু অবৈধই নয়, পার্শ্ববর্তী শত শত একর বোরো ফসলি জমি এবং পুরো পরিবেশের জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তাড়ল ইউনিয়নের নোয়াগাঁও থেকে সরমঙ্গল ইউনিয়নের জুরি-পানজুরি বিল পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন টেনে দিন-রাত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন চলছে।
নোয়াগাঁও গ্রামের কৃষক আব্দুল হেকিম মিয়া দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেছেন—অবৈধ ড্রেজিংকারীরা ৩০ থেকে ৪০ ফুট গভীর করে বালু তুলছে। হাওরের তলদেশের মাটি অত্যন্ত নরম হওয়ায়, এভাবে গভীর খনন চলতে থাকলে পার্শ্ববর্তী শত শত একর মূল্যবান বোরো জমি ধসে বিলীন হয়ে যাবে। এটি স্থানীয় কৃষকদের বছরের একমাত্র ফসল ও শেষ সম্বল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গভীর সাকশন ড্রেজারের কারণে মাটির স্তর ধসে পড়লে পানির টান সৃষ্টি হয়। এতে বোরো জমি ভেঙে বিলীন হওয়া ছাড়াও গ্রামীণ সড়ক দুর্বল হয়ে পড়ে এবং জলধারণ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে মাছের প্রজনন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
কৃষক আব্দুল হেকিম মিয়ার অভিযোগ—ইউএনও-এর কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়ার ১৫ থেকে ২০ দিন পেরিয়ে গেলেও প্রশাসন এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো দিন-রাত সমানতালে চলছে ড্রেজারের শব্দ, আর পাইপ বেয়ে উঠে আসছে বালুর ঢেউ।
স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বার হুসাইন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, “বালু তোলার নির্দিষ্ট সীমারেখা ও আইন রয়েছে। কিন্তু হাওর চিরে এভাবে গভীর খনন করা আইন অনুযায়ী সম্পূর্ণ অবৈধ। প্রশাসন দ্রুত হস্তক্ষেপ না করলে ফসলি জমির মারাত্মক ক্ষতি হবে এবং এলাকায় বড় বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।”
অভিযোগের কপি জেলা প্রশাসক সুনামগঞ্জ, সহকারী কমিশনার (ভূমি), দিরাই এবং দিরাই থানায় পাঠানো হলেও অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ না হওয়ায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন—”কারা এই অবৈধ ড্রেজিংয়ের ছায়া-সমর্থক, যার কারণে অভিযোগের পরেও বালু উত্তোলন বন্ধ হচ্ছে না?”
জানা গেছে, জুরি-পানজুরি বিলটি ধনপুর-নোয়াগাঁও জুরি পানজুরি মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেড-এর ইজারার অধীনে থাকার কথা। তবে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, সমিতির সম্পাদক বিদেশে যাওয়ার পর সভাপতি ও তার অনুসারীরা প্রভাবশালী একটি মহলকে নিয়ে জলমহালের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছেন। দ্বিতীয় পক্ষের অভিযুক্তরা হলেন—ওহাদ আলী (৪০), আজি মিয়া (৫০) ও মকছুদ্ধ মিয়া (৪০)। তাদের বিরুদ্ধে জলমহাল ব্যবহার করে অবৈধভাবে গভীর খনন করে বালু উত্তোলন ও বিক্রির প্রস্তুতির অভিযোগ উঠেছে।
কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ তীব্র হয়ে ওঠায় যেকোনো সময় সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। নোয়াগাঁও ও সরমঙ্গল এলাকার কৃষকরা বলছেন, তাদের শেষ সম্বলটুকু বাঁচাতে তারা যেকোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
দিরাইয়ের জুরি-পানজুরি বিলের এই অবৈধ খনন বন্ধে এবং কৃষকদের জীবন-জীবিকা রক্ষায় প্রশাসন অবিলম্বে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন এলাকার সাধারণ মানুষ ও পরিবেশ সচেতন মহল।




















