ঢাকা ০৩:৩৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫, ৩ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
গহিরা সাগরপাড়ে পাঁচ কিলোমিটারজুড়ে কর্মব্যস্ততার বর্ণিল দৃশ্য

আনোয়ারা উপকূলজুড়ে বিষমুক্ত শুঁটকি উৎপাদনের স্বর্ণসময়

মো. ফখর উদ্দিন, আনোয়ারা
  • আপডেট সময় : ০৬:০৭:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / ৬২ বার পড়া হয়েছে

শীতের হাওয়ায় প্রাণ ফিরে পেয়েছে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার গহিরা সাগরপাড়। উপকূলজুড়ে পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এখন মাছ, রোদ, বাতাস আর শ্রমিকদের অবিরাম কর্মচাঞ্চল্যের বর্ণিল সমাবেশ। শুরু হয়েছে বছরের সবচেয়ে জমজমাট শুঁটকি উৎপাদনের মৌসুম। ভোর থেকে গভীর রাত অবিরত চলছে মাছ নামানো, ধোয়া, শুকানো, বাছাই ও প্যাকেটজাতের ব্যস্ততা। নারী-পুরুষের পাশাপাশি শিশুরাও যুক্ত হয়েছে এই ঋতুভিত্তিক কর্মযজ্ঞে।

লইট্টা, পোপা, চিংড়ি, হুনদারা, কাটা বিভিন্ন মাছের সারি সারি শুকানোর দৃশ্য পুরো সাগরপাড়কে রূপ দিয়েছে এক অনন্য জগতে। ফকিরহাট, ঘাটকুল ও উঠান মাঝির ঘাট মিলিয়ে ১৩টি পয়েন্টে চলছে শুঁটকি উৎপাদন। শতাধিক ব্যবসায়ী এবং প্রতিদিন প্রায় দেড় হাজার শ্রমিক এই মৌসুমী শিল্পে কাজ করছেন। সমুদ্রে মাছ ধরতে ব্যস্ত আরও দুই শতাধিক নৌকা। সব মিলিয়ে পুরো উপকূলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে প্রায় দুই হাজার মানুষের।

মাছ সংগ্রহের পর ঝুড়িতে ভরা কাঁচা মাছ বাছাই করে দ্রুত সূর্যের তাপে ছড়িয়ে দেন শ্রমিকরা। প্রতি ঝুড়িতে থাকে ১০-১২ কেজি মাছ। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে সাধারণ মাছ শুকাতে সময় লাগে তিন থেকে পাঁচ দিন, আর বড় মাছের ক্ষেত্রে সাত দিন পর্যন্ত। পুরো প্রক্রিয়াজুড়ে কোনো ধরনের কেমিক্যাল বা ডিডিটি ব্যবহার করা হয় না এটাই আনোয়ারার শুঁটকির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। ফলে উৎপাদিত শুঁটকি পুরোপুরি বিষমুক্ত, স্বাদে মিষ্টি এবং বাজারে অত্যন্ত চাহিদাসম্পন্ন।

প্রতি শুঁটকি মহাল থেকে সাপ্তাহিক চার থেকে পাঁচ মণ শুঁটকি বিক্রি হয়। খরচ বাদ দিয়ে একজন ব্যবসায়ীর পাক্ষিক লাভ দাঁড়ায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। নারীদের অংশগ্রহণ সবচেয়ে বেশি তারা সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত পরিশ্রম করে প্রতিদিন আয় করেন ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা, যা অনেক পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস।

চাক্তাইয়ের আড়তগুলোতে আনোয়ারার শুঁটকির চাহিদা বরাবরই বেশি। প্রতি মণ চিংড়ি শুঁটকি বিক্রি হচ্ছে ৮-৯ হাজার টাকায়। স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও যাচ্ছে এই শুঁটকি। প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে শুঁটকির জনপ্রিয়তা বাড়ায় রপ্তানির সুযোগও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক বাজারেও জায়গা করে নিচ্ছে গহিরার প্রাকৃতিক রোদে তৈরি বিষমুক্ত শুঁটকি।

উপজেলা মৎস্য দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত বছর আনোয়ারায় উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ৩৫০ টন শুঁটকি। এ বছর তা ৫০০ টন ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। রাসায়নিকমুক্ত শুঁটকি উৎপাদন বাড়াতে মাঠপর্যায়ে জেলেদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক পদ্ধতির প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রায় ২০০ জেলে বিশেষ প্রশিক্ষণ পেয়েছেন।

উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, শুঁটকি শিল্প আনোয়ারার ঐতিহ্যবাহী ও সম্ভাবনাময় খাত। উৎপাদন এলাকা তদারকি, জেলে প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখায় এই শিল্পকে আরও টেকসই করতে সরকারি উদ্যোগ বাড়ানো হয়েছে।

শীত এলেই গহিরা সাগরপাড় পরিণত হয় দেশের অন্যতম ব্যস্ত শুঁটকি উৎপাদন কেন্দ্রে। প্রাকৃতিক রোদ, সমুদ্রবাতাস ও হাজারো শ্রমিকের ঘাম মিলিয়ে আনোয়ারার বিষমুক্ত শুঁটকি এখন দেশজুড়ে আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

গহিরা সাগরপাড়ে পাঁচ কিলোমিটারজুড়ে কর্মব্যস্ততার বর্ণিল দৃশ্য

আনোয়ারা উপকূলজুড়ে বিষমুক্ত শুঁটকি উৎপাদনের স্বর্ণসময়

আপডেট সময় : ০৬:০৭:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২৫

শীতের হাওয়ায় প্রাণ ফিরে পেয়েছে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার গহিরা সাগরপাড়। উপকূলজুড়ে পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এখন মাছ, রোদ, বাতাস আর শ্রমিকদের অবিরাম কর্মচাঞ্চল্যের বর্ণিল সমাবেশ। শুরু হয়েছে বছরের সবচেয়ে জমজমাট শুঁটকি উৎপাদনের মৌসুম। ভোর থেকে গভীর রাত অবিরত চলছে মাছ নামানো, ধোয়া, শুকানো, বাছাই ও প্যাকেটজাতের ব্যস্ততা। নারী-পুরুষের পাশাপাশি শিশুরাও যুক্ত হয়েছে এই ঋতুভিত্তিক কর্মযজ্ঞে।

লইট্টা, পোপা, চিংড়ি, হুনদারা, কাটা বিভিন্ন মাছের সারি সারি শুকানোর দৃশ্য পুরো সাগরপাড়কে রূপ দিয়েছে এক অনন্য জগতে। ফকিরহাট, ঘাটকুল ও উঠান মাঝির ঘাট মিলিয়ে ১৩টি পয়েন্টে চলছে শুঁটকি উৎপাদন। শতাধিক ব্যবসায়ী এবং প্রতিদিন প্রায় দেড় হাজার শ্রমিক এই মৌসুমী শিল্পে কাজ করছেন। সমুদ্রে মাছ ধরতে ব্যস্ত আরও দুই শতাধিক নৌকা। সব মিলিয়ে পুরো উপকূলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে প্রায় দুই হাজার মানুষের।

মাছ সংগ্রহের পর ঝুড়িতে ভরা কাঁচা মাছ বাছাই করে দ্রুত সূর্যের তাপে ছড়িয়ে দেন শ্রমিকরা। প্রতি ঝুড়িতে থাকে ১০-১২ কেজি মাছ। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে সাধারণ মাছ শুকাতে সময় লাগে তিন থেকে পাঁচ দিন, আর বড় মাছের ক্ষেত্রে সাত দিন পর্যন্ত। পুরো প্রক্রিয়াজুড়ে কোনো ধরনের কেমিক্যাল বা ডিডিটি ব্যবহার করা হয় না এটাই আনোয়ারার শুঁটকির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। ফলে উৎপাদিত শুঁটকি পুরোপুরি বিষমুক্ত, স্বাদে মিষ্টি এবং বাজারে অত্যন্ত চাহিদাসম্পন্ন।

প্রতি শুঁটকি মহাল থেকে সাপ্তাহিক চার থেকে পাঁচ মণ শুঁটকি বিক্রি হয়। খরচ বাদ দিয়ে একজন ব্যবসায়ীর পাক্ষিক লাভ দাঁড়ায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। নারীদের অংশগ্রহণ সবচেয়ে বেশি তারা সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত পরিশ্রম করে প্রতিদিন আয় করেন ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা, যা অনেক পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস।

চাক্তাইয়ের আড়তগুলোতে আনোয়ারার শুঁটকির চাহিদা বরাবরই বেশি। প্রতি মণ চিংড়ি শুঁটকি বিক্রি হচ্ছে ৮-৯ হাজার টাকায়। স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও যাচ্ছে এই শুঁটকি। প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে শুঁটকির জনপ্রিয়তা বাড়ায় রপ্তানির সুযোগও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক বাজারেও জায়গা করে নিচ্ছে গহিরার প্রাকৃতিক রোদে তৈরি বিষমুক্ত শুঁটকি।

উপজেলা মৎস্য দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত বছর আনোয়ারায় উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ৩৫০ টন শুঁটকি। এ বছর তা ৫০০ টন ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। রাসায়নিকমুক্ত শুঁটকি উৎপাদন বাড়াতে মাঠপর্যায়ে জেলেদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক পদ্ধতির প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রায় ২০০ জেলে বিশেষ প্রশিক্ষণ পেয়েছেন।

উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, শুঁটকি শিল্প আনোয়ারার ঐতিহ্যবাহী ও সম্ভাবনাময় খাত। উৎপাদন এলাকা তদারকি, জেলে প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখায় এই শিল্পকে আরও টেকসই করতে সরকারি উদ্যোগ বাড়ানো হয়েছে।

শীত এলেই গহিরা সাগরপাড় পরিণত হয় দেশের অন্যতম ব্যস্ত শুঁটকি উৎপাদন কেন্দ্রে। প্রাকৃতিক রোদ, সমুদ্রবাতাস ও হাজারো শ্রমিকের ঘাম মিলিয়ে আনোয়ারার বিষমুক্ত শুঁটকি এখন দেশজুড়ে আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে।